Showing posts with label গল্প. Show all posts
Showing posts with label গল্প. Show all posts

ছাতায় বিষ্টি দরে না, আব্বা

“হ্যালো, কোথায় তুমি?”
“আছি.. তোমার আশেপাশেই কোথাও।”
বিনোদ উৎসুক ভঙ্গিতে মূল গেটের চারদিকে বেশ ভাল করে দেখে নিল।
“কই, দেখছি না তো!”

“বিনোদ, রাইট?”
-- বলে একটা মেয়ে হাসিমুখে এগিয়ে এল, কানে মোবাইল সেট ধরে রাখা।
বাহ, কি যে সুন্দর!
অবাক হলে বিনোদের চোখ ছানাবড় হয়ে যায়, যেন.. রবারের পিংপং বল।
“হুঁ..” -- বলে অবাক হওয়া আকস্মিকতা কাটিয়ে বলল,
“আই সি.. কুসুমিতা, হুম?”
“রাইট য়্যু আর।”
-- এভাবেই মোটামুটি একটা বিস্ময়ের মধ্য দিয়ে ঘটনার শুরু। সংবাদপত্রে দেশীয় চলচ্চিত্রের হালচাল আর আবু ইসহাকের একটি অখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র তৈরির প্রস্তাবনাসম্বলিত চমৎকার একটা আর্টিকেল লেখার পর পত্রিকা অফিস থেকে বিনোদের ঠিকানা সংগ্রহ করে ২/১টা চিঠি চালাচালির মাধ্যমে কুসুমিতার সাথে পরিচয়। তারপর মাঝের হিসেব মোটামুটি সহজ। ঘ্যাঁতঘ্যাঁতে গল্প-উপন্যাস আর প্যাঁকপ্যাঁকে নাটক-সিনেমার মতই দু’জনের মধ্যে বাঙ্গালির সেই.. চিরায়ত প্রেমের সূত্রপাত। এদেশের ছেলে-বুড়ো কম-বেশি প্রায় সবাই-ই কখনো-সখনো গোত্র-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে গেমকে প্রেম বলে অচিরেই ধোঁকা খায়। তসলিমা নাসরিনের একটা কথা বেশ মনে পড়ছে। অনেকটা এরকমই যেন বলেছিলেন, এদেশের ছেলে-মেয়েতে কখনো বন্ধুত্ব হয় না। হুম তা-ই। এদের যা হয়.. তার নাম হয় প্রেম; নয় গেম! বিনোদ সাথে থাকা বন্ধু দীপেনের সাথে কুসুমিতার পরিচয় করিয়ে দিল।

“ওহ হো.. ব্লু টি-শার্ট? মাই ফেভরিট! সো সুইট অফ ইউ, নদ।”

কুসুমিতার চমৎকার কন্ঠে সামনাসামনি হররোজ দিনে-রাতে মুঠোফোনে খলখলিয়ে হেসে-ভালবেসে ডেকে যাওয়া ওর দেয়া স্পেশাল ডাক নামটি শুনে বুকের ভেতর যেন.. লক্ষ পায়রা উড়াল দিল। বেশ স্মার্ট মেয়ে বটে। হাঁটতে হাঁটতে কত কথা হল! হিন্দি সিনেমা-সিরিয়াল, দেশ-রাজনীতি-বিশ্ব.. কোন কিছুই তালিকা থেকে বাদ পড়ল না। হাঁটার ক্লান্তি কমিয়ে নিতে স্মৃতিসৌধের পেছনের দিকের পুকুরের সামনে ঘাসের উপর বসল ওরা। কথার ফাঁকে ফাঁকে দীপেন আর কুসুমিতার চোখাচোখি, সদ্য পরিচিত যুগল চক্ষুদ্বয়ের তীব্র আকর্ষনে উদ্দিপ্ত দৃষ্টির স্মিত হাসিমুখো বিনিময়ের কিছুই এড়াল না বিনোদের।  কেবল.. কোথাও যেন কি নেই, কি যেন কি অদ্ভুত এসব টাইপ অকারণ উদ্ভট-অশুভ কিছু একটা ভেতরে ভেতরে বোধ হচ্ছিল। শুরুর ভাল লাগাটুকু ভীষণ রকম খারাপ লাগায় পালটে যাচ্ছে। নিজেকে বড্ড অপাঙক্তেয় মনে হচ্ছে।

“দীপেন, আপনার চোখ দু’টো কিন্তু বেশ!”
“তাই নাকি! হুম্ম..?”
-- হয়ত কিছুই না, তবু.. ওদের হাবভাব চমকে দিয়েই চমক ভাঙ্গাল বিনোদের। ঐ খানিক দূরেই সরকারী ঘাস-কাটুনে কর্মচারীর দল বিশাল একহাত ধারাল রাম দা দিয়ে খ্যাঁচাখ্যাঁচ খ্যাঁচাখ্যাঁচ অবাধ্যরকম বেড়ে ওঠা ঘাস কাটছে। যদি ওদের কেউ এসে এক কোপে দীপেনের কল্লাটা বলীর পাঁঠার মত ঘ্যাঁচ করে দশহাত দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যেত!

শহর-গ্রাম সব যখন মুঠোফোনের হাওয়ার ভেসে আসা কথা আর বার্তায় দুলছে, তখন এই যাই যাই ডাকবিভাগই বিনোদ-কুসুমিতার কিউপিডের কাজটুকু করে দিয়েছে। তবে মুঠোফোনের নম্বরটা পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কারোই। মনের দরজায় যখন সবে মাত্র কড়া নাড়ার শব্দ হচ্ছে, তখন খুলে দিতে আপত্তি কি আর থাকে রাধা-কৃষ্ণের সামান্য ভক্তের? দিয়েছিল নির্দ্বিধায়। প্রথম প্রথম.. এ-ও সপ্তায়, তারপর দু’তিনদিন বাদে বাদে, তারও পর.. প্রতিদিন, তারও পর পর.. ঘন্টা দুই বাদেই। এভাবে কখন যে.. এধারের সূর্য ওধারে এগোল... সময় গড়াল, দূরত্ব নাই হতে হতে নৈকট্যের দাবিদার হয়ে উঠল! তাই আজ ঘটনার ঘনঘটায় অঘটনের এই পর্দা উঠল। এভাবে নিজেকে অচ্ছুত কোন ভাঁড়ের চরিত্রে অভিষেক হতে হবে, ঘন্টা চারেক আগে স্বপ্নেও ভাবেনি বিনোদ। অদৃশ্য পরিচালকের প্রতি বিষম রাগ হচ্ছে।

“ছার, ফুল নিবেন? আপা রে মানাইবো কইলাম..”

ময়লা হাফপ্যান্ট পরা খালি গায়ের পিচ্চিটা মুখের কাছে সারি সারি ঝুলিয়ে রাখা হাতের বকুল ফুলের মালা থেকে দু’টা বাড়িয়ে ধরতেই বকুলগন্ধী কড়া ঘ্রাণে সম্বিত ফেরে তাঁর। পরিচালকের বিরক্তিটা পিচ্চিটার উপর গিয়ে পড়ে বিনোদের। খুব কড়া করে ধমক দিয়ে একটা কিছু বলতে যাবে, আর..
“না রে, দু’টোয় হবে না। তিনটা দে..”
বিস্ময়ের চোটে শক্ত হয়ে আসা চোয়ালের দাঁতগুলো আস্তে আস্তে হাল্কা হয়ে আসে বিনোদের, কিন্তু পরক্ষণেই বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে যায়। কুসুমিতা ফুলগুলো হাতে নিয়ে নেড়ে-চেড়ে একটা দীপেনের হাতে জড়িয়ে দিল। বিনোদ না দেখার ভাণ করে পিচ্চিটাকে মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করে দিতে নিতেই, কুসুমিতা মানিব্যাগটা কেড়ে নিয়ে পার্স থেকে দু’টা কচকচে দশ টাকার নোট দিয়ে বলল,
“যা ভাগ..”
এরপর মানিব্যাগ ফিরিয়ে দিতে দিতে হাসতে হাসতে বলল,
“নিন সাহেব আপনার ওয়ালেট। মেয়েদের ফুল কিনে দেয়ার মত স্পর্ধা করেন.. সাহস তো মন্দ না!”
বিনোদ স্মিতমুখে খানিকটা হাসার চেষ্টা করে, কিন্তু দীপেনের নাকের কাছে হাত নিয়ে বিভোর হয়ে শুঁকতে থাকা মালাটা দেখে তৎক্ষনাৎ ফাঁটা ঠোঁটের হাসির মতই তা ফুরিয়ে গেল।

“টেক ইট, দিজ ওয়ান ফর য়্যু..”
অপ্রভিতভঙ্গিতে কুসুমিতার ছুঁড়ে দেয়া মালাটা কোলের কাছ থেকে তুলে নিল বিনোদ। রাস্তার কুকুরের চেয়ে খুব বেশি কিছু মনে হচ্ছে না নিজেকে। এতটা অবহেলা!

দীপেনকে আইসক্রীম আনার কথা বলে সরিয়ে বেশ স্মার্টলি কুসুমিতা অদ্ভুতুরে কথা পাড়ল,
“আআম.. নদ, একটা কথা। নেভার মাইন্ড, আমি কিন্তু কুসুমিতা না। আমি...”
থমকে গিয়ে পকেটে রাখা হাত বের করে ঘাড় ঘুরিয়ে ভ্রু কুঁচকে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে পেছনে তাকাল বিনোদ।
“নয়!”
“হুঁম, আমি নীলা। কুসুমিতার ফ্রেন্ড।”
“তু-তুমি.. আইমিন আপনি আ-পনি.. কি বলছেন আপনি জানেন?”
“আই নো.. আই নো... ইটস রিয়েলি স্বকিং নিউজ ফর ইউ। বাট..”
“থামো সুমিতা, দ্যাটস ইনাফ! আমি জানি, এটা তুমিই.. কুসুমিতা; কোন নীলা-টিলা নও। তোমার ভয়েস চিনতে আমার খুব কি কষ্ট হবার কথা?”
“উম, দ্যাটস দা পয়েন্ট। বাট.. আমরা দু’জনেই কথা বলতাম। সামটাইমস ও, সামটাইমস...”
বিনোদ তাচ্ছেল্যের সুরে বলে ওঠে,
“আচ্ছা!”

“বিনোদ?” -- গাঢ় গলায় কুসুমিতা বিনোদের দিকে তাকাল। অন্যমনস্কভঙ্গিতে উত্তর,
“উঁ?”
“ডু ইউ হেল্প মি?”
“হোয়াট কাইন্ড অফ?”
“আই.. আই... আই লাইক হিম..”
বিনোদের চোখ দু’টো শানানো তলোয়ারের মত ঝিলিক দিয়ে উঠল। এই “হিম”-টা যে কে বুঝতে কোন অসুবিধাই হল না। এরই মধ্যে দীপেনও ফিরে এসেছে। খালি হাতে নয় একদম! হাতে তিন তিনটে ইগলু কোম্পানীর কোণ আইসক্রীম। শেষের কথাগুলো দীপেনের কান এড়ায়নি। চুপচাপ সবার হাতে পৌঁছে দিল আইসক্রীমগুলো। কারো মুখে কোন কথা নেই। কুসুমিতা আর দীপেন আইসক্রীম খাওয়ায় মনোযোগী হবার ভাণ করে নীরব পায়ে এগোয়। বিনোদ ওদের পেছনে ফেলে অনেকটাই এগিয়ে গেছে। গলে যাওয়া আইসক্রীমটা হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে থমথমে মুখে হঠাৎ প্রশ্ন করে,
“কুসুমি.. উম.. নীলা, তো.. কুসুমিতা এল না কেন?”
কুসুমিতা খাওয়া থামিয়ে নির্বিকারভঙ্গিতে উত্তর দেয়,
“এসেছিল। কিন্তু ভীষণ নার্ভাস ছিল তাই.. বোনের বাসায় চলে গেছে ধামরাইয়ে। অন্য কোনদিন দেখা করবে বলেছে। তাই তো আমি..”
বিনোদ “হুম”-সূচক শব্দ করে আবারও গম্ভীর হয়। এই অবসরে দীপেন-কুসুমিতার চোখাচোখি।
“চলো.. আইমিন চলুন, যাওয়া যাক।”
“ক-ক-কোথায়!”
“চমকাবার কী আছে, মিস. নীলা? যার যেখানে যাবার কথা সেখানে!”
--বলে বিনোদ দ্রুত ফেরার পথ ধরল।
“ওহ, হুম.. তাই তোহ! অনেক ঘোরাঘুরি হয়েছে, চলুন চলুন..”
গটগট করে একটানা নিঃশব্দে হেঁটে চলে বিনোদ। বিনোদ একা, প্যান্টের পকেটে হাত দিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে চলেছে। নাহ, হিসেব কিছুতেই মিলছে না! পেছনে কুসুমিতা ওরফে নীলা আর বন্ধু দীপেন পাশাপাশি, নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে কিছু বলাবলি করছে আর কিছুক্ষণ পর পর যতটা চেপে পারা যায় হাসার চেষ্টা করছে। খুব ইচ্ছে করছে ঘাড় ফিরিয়ে দু’টোকে দেখে। কিন্তু অমন ইচ্ছের গায়ে পানি ঢেলে দিয়েই স্মৃতিসৌধের গেট দিয়ে বেরিয়ে আসে সে। তারপর বিনা বাক্য ব্যয়ে রাস্তাও পাড় হয়ে যায় সবাই। বাসের জন্য অপেক্ষা চলছে, এমন সময়ে দীপেন-নীলার পারস্পারিক চাহনীর লুকোচুরির চটক ভেঙ্গে দিয়ে বিনোদের কথা বলে ওঠা—
“কুসুমিতা? স্যরি, নীলা!”
“ইয়েস? ইটজ ওকে!”
আবারও নিরবতা, চট করে কিছু ভেবে নিচ্ছে বিনোদ।
“কিছু বলবে, ন.. বিনোদ?”
“হুম, আমি আপনার সাথে যাচ্ছি!”
“মান্নেহ?”
“মানে আমরা ধামরাই যাচ্ছি। আইমিন, আপনি আমায় নিয়ে যাবেন। আর দীপেন তুই হলে চলে যা!”
--কুসুমিতার চোখে বিস্ময় এবং আতঙ্ক দুই-ই। নিজের কানকে কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ও। দীপেনের চোখ নিজের পায়ের আঙ্গুল দেখছে, তার জন্যে বিনোদের কথা বিস্ময়কর হয়ে আসেনি। বরং চিরপরিচিত বন্ধুর ঐ সব মেনে চুপ মেরে যাওয়াটাই ভেতরে বিস্ময় জাগাচ্ছিল। এই একগুঁয়ে স্বভাবটাই তো বিনোদের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তার মানে “সামথিং ইজ রং”-এর এই খটকাটা টের পেয়ে গেছে ও! তাই সত্য জানার স্বভাবসিদ্ধ আচরণের জানান দিচ্ছে।

“আই নো.. আই নো.. তোমার ভেতরে কি হচ্ছে, নদ। আকচুয়েলি.. আই ক্যান ফিল! বাট..”
“নো, নো.. ইউ কান্ট ফিল, মিস. নী-লা! ইয়েস, ইউ কান্ট..”
“স্ট্রেঞ্জ, ধামরাই যাবোটা কোথায়? আর কেনইবা?”
“হাহ হা হা.. হোয়াট আ জোক! এর মধ্যেই ভুলে গেলেন? আপনার বান্ধবী কু-সু-মি-তা ‘বোনের বাসায় চলে গেছে ধামরাইয়ে’ বললেন যে!”

নীলা অপ্রভিত হয়ে তাকিয়ে বিনোদের দিকে। এই ছেলে খেপলো নাকি? এতটা ভালবাসে! সবটা জেনেই ছাড়বে দেখছি, কী যন্ত্রণা!

“কি হল? চুপ খেয়ে গেলেন যেহ? ডোন্ট ওওরি, আমি সব ম্যানেজ করে নেবো। কাউকে কিছু বুঝতে দেবো না, জাস্ট ওর সাথে একান্তে কথা বলে জেনে নেবো—‘কেন সে এমন করল, কি তার ইচ্ছা কি এমন ঘটল যে দেখা না করেই চলে গেল’ এইসব আর কি!”
“নদ, ওর বোনের শ্বশুড়বাড়ি খুব কঞ্জারভেটিভ। এভাবে একজন ছেলেবন্ধুকে নিয়ে গেলে হাজার কথা উঠবে। ইউ আর আ স্মার্ট পার্সন, বুঝতে পারছেনই তো..”
--ড্যাবড্যাব চোখ মেলে নীলা বিনোদের দিকে তাকিয়ে দেখছিল, লাস্ট ওষুধে কাজ করে কিনা। চ
“হুম, বুঝলাম! আমার যা বোঝার আমি বুঝে গেছি। কথায় কথায় অনেক বাস মিস করেছি। এবার একটায় উঠি। চল দীপেন..
নিরব দর্শক দীপেনের বুকের ঢিপঢিপে ভাবটা হঠাতই কেটে গেল, না চাইতেও মুখের হাসি দাঁত বের করে নিজের উপস্থিতিটা জানান দিয়ে বসল। থতমত খেয়ে সাথে সাথে নীলার দিকে তাকাল, নীলাকে নিশ্চিন্ত আর ডিটারমাইন্ড দেখাচ্ছে। কী উপস্থিত বুদ্ধি যে ওর! ভেবে বেশ গর্ব হচ্ছে।
কাছে চলে আসা একটা বাসে কেউ-কারও দিকে না তাকিয়েই হুড়মুড় করে উঠে পড়ল ওরা। দীপেন আর বিনোদ ডানদিকের সারিতে, নীলা একা বাঁদিকের সারির সিটে। কেউ কোনো কথা বলছে না। যেন এই নিরবতাটা না হলেই নয়। অথচ গোটা বাসটা হঠাত আসা টিপটিপে বৃষ্টির আগমনের উদ্দেশ্য-পরবর্তী অবস্থা-পরিণতি নিয়ে আলাপচারিতায়, তর্কে-বিতর্কে সরগরম হয়ে আছে। ম্যাসেজের শব্দে বিনোদ দীপেনের হাতের দিকে তাকাল। ও অমন অস্বস্তিবোধ করছে কেন? ওকে রিল্যাক্স করতে নীলার দিকে চোখ ঘুড়িয়ে নিল। নীলার চোখও মোবাইলের স্ক্রীনে! হঠাত ম্যাসেজের শব্দে আর মোবাইল স্ক্রীনের লাইট জ্বলে ওঠার সাথে সাথে ওর ঠোঁটে ফুটে ওঠা কেমন মিষ্টি রকম এক দুষ্টু হাসি চোখ এড়াল না বিনোদের। কি মনে হল, হঠাত চট করে দীপেনের দিকে ঘাড় ঘোরাতেই হাতের মোবাইলটা তড়িঘড়ি লুকালো ও। কি যেন আবারো বোঝা হয়ে গেছে দৃষ্টি নিয়ে বিনোদ সোজা হয়ে বসল, ম্যাসেজ চালাচালি চলছে তো চলছেই। তবে এবার অনেক সতর্কতা নিয়ে, রিংটোন সাইলেন্ট করে। এক একটা ম্যাসেজ আসা-যাওয়া টের পায় আর বিনোদের ভেতরটা ছুড়ির আঘাত অনুভব করে। তবু আহত দৃষ্টিটাকে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলে তার ড্রাইভারের সামনের জলের ফোঁটাদার বিশাল কাঁচটায়। নাহ, এভাবে হয় না!

“এখানে রাখেন তো ভাই, নামবো!”
দীপেন হা করে তাকিয়ে।
“একটা কাজ করতে ভুলে গিয়েছিলাম। তোরা যা, আমি সেরে আসছি।”
নীলার স্পষ্ট খুশিটা চাপা দেয়ার ব্যর্থ ন্যাকামীটাও চোখ এড়ায় না বিনোদের।
“আসছি, নীলা। ভাল থেকো কুসুমিতা!”
-- বলে উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই নেমে পড়ল। নীলার খুশি দপ করে নিভে গিয়েছিল হঠাত, মিথ্যার গায়ে সত্যের চাবুক পড়ল কি!

মোবাইলটা একটানা চিতকার করে চলেছে বাস থেকে নামার পর থেকেই। কপাল কুঁচকে পকেট হাতড়ে রাগত হাতে চিতকারটা থামিয়ে দিল। এবার আর কোন কলই আসবে না। বড় বড় করে দু’বার করে শ্বাস নিল আর ছাড়ল। একটু রিল্যাক্সড হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করতেই মুখের ভেতরটা কেমন বিস্বাদ বিস্বাদ ঠেকল। এবার সতর্কভঙ্গিতে হেঁটে একটা পানের দোকান থেকে মিষ্টি জর্দামাখা এক খিলি পান বেশ আয়েশীভাবে মুখে পুরে পা বাড়াতেই টিপটিপে বৃষ্টি থেকে মুষলধারীর সাথে বিনোদের এই বর্ষায় প্রথম আলাপ। ভিজে যাচ্ছে, অল্প থেকে পুরো ভিজে যাচ্ছে। ডেইরী ফার্মের ভেতরদিকটার রাস্তায় ঢুকে পড়ল সে। কত সাত-পাঁচ ভাবল, আজকের কথা, গতকাল পর্যন্ত কুসুমিতার সাথে যা যা হয়েছিল তার সবটা এক এক করে। ধরা পড়ে গিয়েছ নীলা, প্রতিদিনের অভ্যেস একদিনের সতর্কতার বাঁধ মানেনি। খুব ঠিকঠাক ধরা পড়ে গেলে— এইসব ভাবতে ভাবতেই আনমনে হেঁটে চলছিল সে।

“ছাতায় বিষ্টি দরে না, আব্বা!”
কথাটা কানে যেতেই ঘুরে দাঁড়ায় বিনোদ। সত্যি-ই তোহ ‘ছাতায় বৃষ্টি ধরল না ওর-ও’।

“ক্যারে ছ্যাঁরা, এত কইরা কইলাম কোলে ওড, কোলে ওড। হুনলি না। বোজ অহন!”
“ন্যাতাইন্না পুরান ছাতা, টুডা-ফুডা। আমার কি দোষ?”
“চুপ থাক, দিমু কেন্নু। জলদি ল..”

বাচ্চা ছেলেটা বাপের তাড়া আর ছেঁড়া ছাতায় ছিটকে পড়া বৃষ্টির বেপরোয়া ছিটে থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে করতে আধ-ভিজে হয়ে হয়ে দৃষ্টির আড়াল হয়ে গেল। বিনোদের দৃষ্টি তবু কিছুক্ষণ ওখানেই দু’টো মানুষের সেই অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পথেই আনমনে তাকিয়ে থাকল। ওর কাছে ছাতা ছিল না, প্রস্তুতই ছিল না ও এমন বৃষ্টির জন্যে। থাকলেও কি ব্যবহার করত ছাতাটা? পারত এমনভাবে ভিজে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে? নাহ, সব ছাতায় বৃষ্টি ধরে না। হয়তো.. সবার ছাতায় বৃষ্টি ধরে না...
পাশের গাছটার ধারে ধপ করে বসে পড়ল বিনোদ। তারপর হু হু করে কেঁদে উঠে গাছের গায়ে মাথার পেছনটা ঠুঁকে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলে উঠল—
 “দরে নাই, আব্বা.. আইজও আমার ছাতায় বিষ্টি দরে নাই, আব্বা.. আইজও ধরাইতে পারলাম না.. খুব ভিজা গেছি, খুব ভিজতাছি...”

অপ্রাসঙ্গিক




(কিছুটা শুরুর দিকের লেখা। কাঁপা হাতে, কাঁচা তো বটেই! ২০০৭/৮ এর দিককার লেখা হয়তো। ভাবনাটা তারও আগের। সাভারের এক গ্রাম্যতা দোষেদুষ্ট পাড়াগাঁর বাস্তবতায় লেখা ছিল।)


অপ্রাসঙ্গিক 

আজও দু’তিনটার বেশি খ্যাপ না পেয়ে দুপুরের প্রবল বৃষ্টিটা মাথায় করেই ভাত খেতে বাড়ি চলে আসে কদম আলী। রিক্সার টুং টাং শব্দ পেয়ে ঘরের বাহির হয় জয়নব। ত্রস্ত পায়ে উৎসুকভঙ্গিতে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। ক্লান্ত স্বামীকে দেখেই দ্রুত হাতে দাওয়ায় বসার জন্য পিঁড়ি এগিয়ে দিল।

        কদম গামছায় গা মুছে দাওয়ায় বসে। হাত দিয়ে ভেজা চুল-দাঁড়ি ঝারতে ঝারতে পেটে দৌড়নো খিদা নামক ছুঁচোর বিশাল তাড়া খেয়ে,

“তড়তড়ি ভাত দে..”

-- বলেই বেড়ার ফাঁকে রাখা পাখা হাতে বাতাস খেতে থাকে। জয়নব ভাত বাড়তে বাড়তে স্বামীর সাথে দু’চারটা ঘর-গৃহস্থির কথা কয়। কদম এই ফাঁকে চালা থেকে ঝরে পরা বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দু’হাতে জমিয়ে সেই পানি দিয়ে কুলকুচাটা সেরে নিতে নিতে নিরবে শুধু হুঁ-হাঁ করে। কিন্তু গলির ভেতর টেম্পোর ভটভট শব্দ শুনতেই ঐ হুঁ-হাঁ’টুকুও থেমে যায়। জয়নবের সব কথা ধীরে ধীরে শ্রবণ সীমার বাইরে চলে যেতে থাকে। শুধু কানে বাজতে থাকে টেম্পোর একটানা ভটভট ভটভট শব্দ। উদাসভঙ্গিতে বাঁশের খুঁটিতে ঠেস দিয়ে কদমের ভাবনা জাগে, ক’মাস আগেও তাঁর কত্ত পসার ছিল! হাতেও জমে ছিল বেশ কিছু কাঁচা পয়সা। গলির মোড়ে রোজ বিকেলে আরাম করে রিক্সায় বসে বসে ঝিমুত। আর দুপুর হলে প্রায়ই কলিমুদ্দি ব্যাপারীর ফার্স্টক্লাস হোটেলের টলটলে ডাল, ইলিশের দোঁপেয়াজা; নয় অন্য কোন শাক-মাছ দিয়ে আয়েশ করে ভরপেট খেয়ে উঠত। খ্যাপের জ্বালায় দু’দন্ড বসে থাকার জো ছিল না। তবু মাঝে-সাঝে কতই না ফৈদ্দারি করে বেড়াত। চাহিদা মত ভাড়া না পেলে কিসের কি! প্যাসেঞ্জার তুলতই না। আর এখন ঝাঁক বেঁধে টেম্পো আসতেই রুটি-রুজিতে টান পরেছে। প্যাসেঞ্জার সব জনপ্রতি ৫ টাকার টেম্পোতেই চড়ে, পারতে-সাধতে ১৫ টাকার রিক্সায় চড়ে কেউ আর টাকার শ্রাদ্ধ করতে চায়-ই না। হাজার ডাকেও প্যাসেঞ্জাররা ফিরে তাকায় না। যদিও বা ২/১ জনের কৃপাদৃষ্টি মেলে, তবে ভাড়ায় বনিবনা না হলে মুখ ঝামটা দিয়ে চলে যায়। কদমের তাই চিন্তায় চিন্তায় কপালে স্পষ্ট ভাঁজ, চোখটাও দেবে গেছে কোটরে। কাশেম, ওলী, বিনোদ, নজিম ঐসব টেম্পো-ড্রাইভারদের আয়েশী ভঙ্গিতে পান চিবিয়ে চিবিয়ে ঝিমুনোর কথা, আর টাকার মোটা তোড়া গোণার সময়কার সুখ সুখ মুখগুলো ভাবতেই মেজাজ খিঁচড়ে ওঠে।

        জয়নব ভাতের থালা হাতে সামনে এসে দাঁড়ায়। স্বামীর উদাস করা অন্যমনস্কতা দেখে থালাটা শব্দ করে পাশে রেখে গলা খাঁকারি দিয়ে একটু জোরেই বলে ওঠে,

“আমনের ভাত..”

কদমের সম্বিৎ ফেরে ঠিকই, তবে রাগত ভঙ্গিতে থালার দিকে চেয়ে থাকে। ক’দিন বাদে এই এক থালা গরম ভাত আর আলুভর্তাও পাওয়া না পাওয়ার সন্দেহের দোলাচালে দুলতে দুলতে কোন রকমে খুঁটি ধরে উঠে দাঁড়ায় সম্মোহিতের মতন। জয়নব স্বামীর রাগত মুখটার দিয়ে চেয়ে অবাক হয়। ভয়ে ভয়ে কদমের গায়ে আলতো হাত রেখে বলে,

“হইল কি! ভাত খাইবেন না, বাবুর আব্বা?”

এক ঝটকায় গা ঝাড়া দিয়ে হাতটা সরিয়ে দেয় কদম। পেটা শরীরের মানুষটার হঠাৎ ধাক্কায় স্যাঁতস্যাঁতে দাওয়ায় পরতে পরতেও কোন রকমে টাল সামলায় জয়নব।

“দূরু মাগি, তোর ভাত তোর ভাতার গো খাওয়া।”

-- বলে গটগট করে গামছাটা কাঁধে ঝুলিয়ে বড় বড় পদক্ষেপে বেরিয়ে গেল। তখনও বৃষ্টি ছিল, এখনও ঝরছে তো
ঝরছেই অবিরাম.. বড় বড় ফোঁটায়.. একটানা। মাঝে কেবল হল্কা হাওয়ার একটা প্রকান্ড, অথচ অকারণ তরঙ্গ বয়ে গেল মিনিট কয়েকের এই মধ্যাহ্নিক সময়টায়। ঘটনার আকস্মিকতায় জয়নব শুধু স্তব্ধ চোখে কদমের চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে থেকে শব্দগুলোর প্রাসঙ্গিকতা খোঁজে। বাইরে তখনও জল.. আছড়ে পড়ছে বৃষ্টি...

আততায়িতা



(১) 

বেলায়েত করিম ঝোলে মাখা হাতের আঙ্গুলগুলো আয়েশীভঙ্গিতে চাটতে চাটতে হঠাৎ হোটেলের বাইরের দিকটায় চোখ পড়ল।

“কি রে, খাবি?”

সাগ্রহে কিশোরী মেয়েটি ড্যাবড্যাবে চোখ তুলে সজোরে উপর-নিচে “হ্যাঁ-সূচক” মাথা নাড়ল। মেয়েটিকে ভেতরে আসার জন্যে হাত নেড়ে ইশারা করেই হোটেলের পিচ্চিটাকে ভাতের অর্ডার দিলেন।

“কি দিয়া খাবি? সবজি, মাছ না.. ক, কঅঅ...”

মেয়েটি নানা রকম ভঙ্গি করে এ এয়াও টাইপ অদ্ভুত গোঁঙ্গানী তুলে যা বলল তার অর্থ দাঁড়াল, সে মাছ দিয়ে খেতে চায়। করিম বুঝলেন, মেয়েটা বোবা। তিনি আবার সজোরে চেঁচিয়ে পিচ্চিটাকে মাছ তরকারি দিতে বললেন। পিচ্চিটা টেবিলে খাবার লাগাতে না লাগাতেই মেয়েটি হাত ধোওয়ার বালাই না করেই গপাগপ খেতে শুরু করল। করিম তৃপ্তির সাথে এমন বিরল দৃশ্যের অবতারণা হতে দেখে সবিস্ময়ে হেসে বলে উঠলেন,

“করোছ কি ছেমড়ি? আস্তে খা.. গলায় ঠেকব তো!”

মেয়েটি হঠাৎ আদুরে সুরের আলতো ধমক খেয়ে খাওয়া থামিয়ে ঢোক গিলতে নিতেই হেঁচকি শুরু হয়ে গেল --

“হেঁচুক, হিঁইইচুক...”
“হুর ছেমড়ি, হুঁশ কইরা খাবি তা না.. হইল তো?”

পানির গ্লাস এগিয়ে বললেন,

“নে পানি খা.. সোয়াস্তি পাবি।”

মেয়েটি ঝোলে-ভাতে মাখা হাতেই তড়িঘড়ি ঢকঢক করে সবটুকু পানি খেতে নিতেই এবার কড়া একটা ধমক খেল। গ্লাসটা টং শব্দ করে টেবিলটায় নামিয়ে রেখে হলুদ দাঁত বের করে করিমের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি একটা হাসি দিল।

“মা-বাপ কেউ আছে?”

মেয়েটি মুহুর্তেই ছলছল চোখে বিষন্নভাবে নেতিবাচক মাথা নাড়ল।

“থাকস কই? কার লগে?”

মামীর গরম পানি ঢালা ফোস্কা পরা পা’টা টেবিলের নিচে আলতো করে সরিয়ে ব্যথাটা হজম করে দূরের বস্তিটার দিকে হাত উঁচু করে ধরল। করিম তার মায়ের কুলখানিতে জনা-চারেক এতিম বাল-বাচ্চা খাওয়ানোর কথা মনে পড়তেই বলে উঠলেন,

“যাবি আমার লগে?”

মেয়েটি ডান দিকে ঘাড়টা ঈষৎ হেলিয়ে সম্মতি জানাল। করিম কিছুক্ষণ কি যেন ভাবলেন। তারপর প্রসন্ন মুখে বললেন,

“ল’ যাই.. আমার বাড়ি থাকবি, খাবি, কাম করবি... লহ..”

বাসন্তি; আমাদের গল্পের সেই মেয়ে। মামা-মামীর সংসারে ছেঁড়া চটির মতই এক কোণে পড়ে থাকা অবহেলিত কিশোরী। বিল দেয়া হলে উস্কখুস্ক চুলের তেলচিটে জামার বাসন্তি চলল নতুন আশ্রয়ে বেলাপুর থেকে ছ’-সাত গ্রাম পরের মাঝবয়েসী করিমের হাত ধরে।



(২)

“নিয়া আসলাম। এতিম।
দুইদিন বাদে আম্মার কুলখানি হের লাইগা...
তোমার কামে আইব, রহিমের মাও।”

জগতে নারী জাতটার তিন ধরন। কেউ লোহার চেয়েও কঠিন; হাল্কা ঠোঁকাতেই আমাদের মুখ-মাথা চ্যাপ্টা হওয়ার জোগার। কেউ বরফগলা পানি; একবার গলতে শুরু করলে আমাদের প্রশান্তির সীমা থাকে না। আর কেউ কেউ আবার আগুনজ্বালী মোম; নিজেকে নিঃশেষ করে ঘরে ঘরে আলোক উদ্ভাস তুলে ধরেন। করিম গিন্নী দূর্ভাগ্যবশত প্রথম সারির। তাই দরজা খুলে যেতেই অবাক হয়ে ভ্রুকুটি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গিন্নীকে এভাবেই চিরায়ত কৌশলে বশ করেন করিম। এরপর বাইরের ঘরে বাসন্তিকে রেখে শোবার ঘরে ঢুকে যুক্তি চলে স্বামী-স্ত্রীতে। স্বামীকে লুঙ্গি-গামছা ধরিয়ে ধুরন্ধর মহাজনী টাইপ চিপা হাসি ঝুলিয়ে করিম গিন্নী বাসন্তির কাছে চলে আসেন।

“নাম কি রে তোর?
এ আল্লা, তর তো জবান বন্দ!
আইচ্ছা, আইজ থিকা তর নাম... ‘বুবি’, হইল?”

বাসন্তি নতুন ঘর, নতুন নাম পেয়ে নিরাপদ সুখী দিনের আভাসে গদগদ হয়ে চকচকে চোখ তুলে হাসি দিল।

“আয়, তরে ঘর-বাইর ঘুইরা দেহাই।”



(৩)

সুখ নামের শুকপাখিটা যে কতটুকু স্থায়ী ক’দিন বাদেই বাসন্তি টের পেয়ে গেল। নতুন আশ্রয় তার কাছে যতীনের ঠাকুমার কাছে শোনা পুন্নামের চেয়েও ভয়ঙ্কর! এখানে দিন যেন ২৪ সহস্র বছর, রাত কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র! বাইরের মানুষের কাছে করিম সাহেবের খাতির আরো কয়েক কদম বেড়ে গেছে বাসন্তির মত বোবা অসহায়াকে আশ্রয় দেয়ায়। গাঁয়ের স্কুল বা কোন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি, ওয়াজ-মাহফিলে বিশিষ্ট বক্তা ইত্যাদি হবার সৌভাগ্যে তার সিজদা দেয়া কপালের দাগটা আরও প্রাজ্জ্বল, আরো গদগদে টাইপ দগদগে হয়ে উঠেছে। পাড়ার গিন্নীমহলেও করিম গিন্নীর বেশ নাম-ডাক। হাভাতে লোকের ঘরে.. পাত ছেড়ে ভাত দাঁড়াতেই... বিশ্বাসের প্রদীপ নিভু নিভু। আর তাই মামীর বঞ্চনাপীড়িত পোড়াকপালী হয়ত.. ঈশ্বরের উপর বিশ্বাস না রাখতে পেরেই স্বেচ্ছায় পা বাড়িয়ে ছিল নতুন আশ্রয়ের খোঁজে। ঘটনাক্রমে আজ তাই কর্মফলের হিসেব মেলাতেই বেলায়েত করিমের এই ঠিকানায় তার হাজতবাস।



(৪)

দু’দিনের বাসি ক্ষুধায় বাসন্তির পেটের ভেতর যেন খিদের ঘায়ে কুত্তা পাগল অবস্থার ইঁদুরগুলো গোল পাকাচ্ছে। মেহমানকে চা-বিস্কুট দিতে এসে হঠাৎ তার মনে পড়ল, প্রায়ই খালাম্মা না থাকলে করিম খালু তাঁকে ভাত-তরকারির লোভ দেখিয়ে আদর করে; বুকে-পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। মাঝে-সাঝে বুক খামচে ধরা, ঠোঁটে টকাস করে চুমু দিয়ে বসা রহিম ভাই সেদিন রাতে হঠাৎ রান্নাঘরে ওকে জড়িয়ে ধরে নিচে ফেলে কয়েক ঘন্টা কি গা ঘিনঘিনে কারবারটাই না করল! ব্যথায় নিন্মাঙ্গটা জ্বলে-পুড়ে যাচ্ছিল। কিন্তু কাউকে বলেনি। সে বুঝে গেছে.. বললে এদের দেয়া ভাতের সহৃদয় পাটটুকুও চলে যাবে। তাই মনকে বলেছে ভুলে যা, চোখকে বলেছে বন্ধ থাক, শরীরকে বলেছে সয়ে যা। আজ সেই টেকনিকটাই খাটানোর চেষ্টা করল বেঢপ রকমভাবে জেগে ওঠা বনসাঁই বুকের উপর জামাটা তুলে ধরে। ওর নগ্ন বুক দেখে রহিমের বোনের শ্বশুরবাড়ির লোকটা থতমত খেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন। করিম গিন্নী ছুটে এসে রকম-সকম দেখে লোকটার হাত-পা ধরে সাত-সতেরো বুঝিয়ে ঘটনা চাপা দিলেন। এরপর রাতে কয়েক প্রস্থ চলল বাসন্তির নরকবাসের পুরাতন পাঠ। মরা কুকুর তড়িঘড়ি আলগা মাটিতে চাপা দিতে গেলে ক’দিন পর মাটি উঁচু হয়ে ভেঙ্গে পড়ে দূর্গন্ধ ছড়ায়। বাসন্তির সেই ঘটনাও তার শেকড় ছড়াতে শুরু করেছিল। এর ক’দিন পর পর অভুক্ত বাসন্তির সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার ফল দাঁড়াল, চক্ষুলজ্জার গায়ে পেচ্ছাব ঢেলে থোড়াই কেয়ার করা টাইপ ক্রমশ বেড়ে চলা পেট। করিম গিন্নীর গঞ্জনার ভাষায় “পেট বাজানো”। অতঃপর গাঁয়ের পঞ্চায়েতে ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের দলের যাকে-তাকে যখন-তখন বুক দেখানো, জড়িয়ে ধরা, নিন্মাঙ্গের স্পর্শ করানো, বিশেষ ইশারা করা ইত্যাদি ইত্যাদি সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ে পাগল সাব্যস্ত করে দোররা মেরে করিম পরিবার থেকে তাড়িয়ে দেয়া হল। বাসন্তি সেদিন বাতাস ভারি করা তীব্রতায় আকাশ ফাটিয়ে চিৎকার করে যতই করিম খালু, রহিম ভাই আর.. সেই যুধিষ্ঠিরদের দেখিয়ে তাঁদের বোল খুলে দিতে চেয়েছে, ততই সবাই তাঁকে পাগলি ভেবে আরো প্রচন্ডতায় দুষেছে। তারপর তার ঠাঁই অন্য কোথাও, অন্য কোনখানে।

(৫)

গ্রাম ছাড়া হয়ে হাট-মাঠ পেড়িয়ে কতজনের কাছে চেয়ে-পেতে ভাত খেয়েছে বাসন্তি! বোকাটে ভঙ্গিতে দু’পা ছড়িয়ে ছড়িয়ে হেঁটে বাড়িয়ে তুলেছে পেটের আকৃতি। যখন যেখানে গেছে সেখানেই আলোতে কিংবা অন্ধকারে টের পেয়েছে লোলুপ চকচকে ভীষণ সব দৃষ্টির গুপ্ত অনুসরণ। আজ হাঁটতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। যেন.. যেন... পেটটার ওজন দ্বিগুণ-তিনগুণ হয়ে গেছে। কিংবা কোন ছোট্ট-খাট্ট হাতি ঢুকে পড়েছে চামড়া ঘেরা সেই বিশাল গরাদখানায়। কিন্তু পৃথিবীতে ক্ষুধাই সম্ভবত একমাত্র ব্যাপার যার জন্যে গরিবের মরারও সময় থাকে না। আর এ তো সামান্য হাতিপোষা ব্যথা! নদী পাড়ের গাছতলায় একপাশ হয়ে শুয়ে থাকা বাসন্তি বটগাছটার মোটা শেকড় ধরে ক্ষুধার প্রচন্ডতায় উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছিল। সারাজীবনে এই একটা জিনিসের উপরে ওর কোন সহ্য ক্ষমতা নাই। ক্ষুধা লাগলে আন্ধারী লাগে, চোখের সামনে সাদাটে ভাতের সোনামুখই ভাসে কেবল। তখনই দে ছুট বাজারের দিকে। তারপর এ-ওর কাছে হাত পাতে। দয়াপরবশ হয়ে হয়ত কোন কোন ক্রেতা দু’চার টাকা দেয়, কোন বিক্রেতা পাশের হোটেলে ভাত খাইয়ে বিলটা দিয়ে দেয়। এভাবে কোনদিন দু’বেলা জোটে, আর কোনদিন একবেলাই জোটানো দায় হয়ে পড়ে। রোজ রোজ একই মুখের ফকিন্নীকে কোনরকম সুবিধাপ্রাপ্তি ছাড়া কে আর বল লাই দিতে চায়? কিন্তু কেন যেন.. মাঝে-সাঝে ভেতরে নাড়া দিয়ে যাওয়া পেটটার প্রতি তার সব মনোযোগ। তাই সহজে আর সেই পুরনো পথে ঘেঁষে না। বাজারের কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ পেটটা তীব্রভাবে ব্যথা করতে থাকে। বাসন্তি ব্যথার চোটেও ক্ষুধার কথা ভোলে না। আরও দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতেই হাত-পা ছড়িয়ে রাস্তায় শুয়ে পড়ে। ভ্যানে করে পাশ দিয়ে যাওয়া এক বুড়ি মহিলা সঙ্গের লোকটাকে ভ্যান থামাতে বলে। এরপর নেমে এসে বাসন্তির রকম-সকম দেখে লোকটাকে চিৎকার করে ডাকে,

“সখিনার বাপ, এদিক আহেন।
ছেমড়ির বেদনা উডছে।
গঞ্জের হাসপাতালে নেওন লাগব.. শিগগির আহেন...”

ততক্ষণে বাসন্তির পানি ভাঙ্গতে শুরু করেছে। সখিনার বাপ মাথার টুপিটা ভাল করে মাথায় চেপে ভ্যানচালককে নিয়ে টেনে-টুনে কোন রকমে বাসন্তিকে ভ্যানের পাটাতনে শুইয়ে দিয়েই পড়ি কি মরি দে ছুট। পৌনে একঘন্টার দীর্ঘ পথ পেড়িয়ে তারা হাসপাতালে পৌঁছল। ডাক্তাররা বয়স অনুযায়ী একটু বেশিই সিরিয়াস কেস দেখে দ্রুত ওটির পাশের রুমটাতে সিফট করলেন। তারপর সেদিন চিৎকারে আকাশের সবটুকু মেঘের জল ঝরিয়ে বাসন্তি জন্ম দিল এক চাঁন-সফেদী ছোট্ট ছোট্ট হাত-পাওয়ালা মাংসপিন্ডের। ডাক্তাররা যখন বাচ্চাটাকে ওর পাশে শুইয়ে দিল তখন এক বেহেস্তী হাসির ঝলক ওর চোখে-মুখে ঝিকিয়ে উঠেই মুহূর্তে ধারাল তলোয়ারের মত তীব্র এক জান্তব ছাপ তা পালটে দিল। মাংসপিন্ডটার প্রতিটি নড়াচড়া লক্ষ করতে করতে হঠাৎ দেখল, মুখটা যেন ক্রমেই একবার করিম খালু, একবার রহিম ভাই, এভাবে বারবার একেকজনের মুখাবয়বে পালটে যেতে থাকল! ঘেন্নায় বাসন্তির গা গুলিয়ে আসতে চাইল। হঠাৎ বাচ্চাটার গলা দু’হাতে ভীষণ করে চেপে ধরে ভয়ঙ্কর রকম গুঙ্গিয়ে উঠল সে। পাশের বেডের মহিলাগুলো কান্ড দেখে চিৎকার করতেই ডাক্তার-নার্স ছুটে এসে বাসন্তির পাশবিকতায় মুহূর্তখানেক থমকে দাঁড়াল। তারপর দ্রুত ছুটে এসে বাচ্চাটাকে ছাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু বাসন্তি যেন মরণপণ করে বসে আছে, সে তার হাতকে আরও দৃঢ় করল। একসময় বাচ্চাটাকে ছুটিয়ে নিলেও ততক্ষণে পাখি খাঁচাছাড়া হয়েছে। ডাক্তার দেখলেন, রক্তশুন্য ছোট্ট সফেদ দেহটা যেন আরও সফেদ হয়ে উঠেছে। আর গলায় অবাধ্যরকমভাবে পড়ে আছে বাসন্তির দশ আঙ্গুলের দগদগে দাগ! ভোজবাজির মত হঠাৎ যে বাসন্তির কি হল! ডাক্তারের হাত থেকে বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নিয়ে চোখে-মুখে গাড় করে চুমু খেল। তারপর এ এয়াও টাইপ বিচিত্র সব শব্দে আদুরে ভঙ্গিতে কি যেন সব বলতে লাগল। নার্সরা বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য এগুতেই ডাক্তারের ইশারায় থেমে গেল। ভয়ে-আতঙ্কে সবাই দেখতে লাগল, বাসন্তি কামিজটা উঁচিয়ে ধরে দুধে ভারি হয়ে আসা অপুষ্ট স্তনটা বাচ্চার মুখে পুরে দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। শেষে মুখের উপরে স্তনের বোঁটাটা ছুঁয়ে রাখতেই দরদর করে হলুদাভ দুধের স্রোত বয়ে যেতে লাগল শিশুটির ঠোঁটের কোণ বেয়ে বেয়ে। কোন এক রোগিনীর শয্যাপাশে ভাত খেতে থাকা তার বুড়ো এক সঙ্গিনী হঠাৎ এমন আজব দৃশ্যে চমকে উঠে “আল্লা গো” বলে চিৎকার করেই মুর্ছা গেলেন। ডাক্তার সচকিত হয়ে মহিলাকে সরিয়ে নেয়ার জন্যে নার্সদের ইশারা করলেন। চিৎকারের আকস্মিকতায় বাসন্তি তাকিয়ে দেখল, একথালা ভাত! তখনই বাচ্চা ফেলে ওদিকটায় ছুটে গিয়ে থালাটা সজোরে ছুঁড়ে মারল। এবার ডাক্তার কি যেন ভেবে মুহূর্তে দু’চারজঙ্কে নিয়ে বাসন্তিকে ধরে ফেললেন। তারপর ওকে লেবার রুমে নিয়ে যেতে বলে দ্রুত নিজের রুমে গিয়ে মোবাইলে বিপ বিপ শব্দ তুলে নাম্বার ডায়াল করতে লাগলেন। তখন তার কপালে একরাশ ঘামের উদয়, টুপটাপ তা আবার ঝরেও পরছে।


(৬)

“তোমার ভাত..”

দু’হাঁটূর মাঝে গুঁজে রাখা মুখ তুলে নিষ্প্রভ চোখে বাসন্তি মহিলার চলে যাওয়া দেখে নিল। পায়ের কাছে কিছুটা সভয় দূরত্ব রেখে ভাতের প্লেটটা রাখা। বাসন্তির মুখে অবজ্ঞার একটা হাসি খেলে গেল।

“হেরা আমারে ডরায়!
পাগল? বাসন্তি পাগল..?
হহ, পিরথিমীর হগলতে জানুক.. হেগর বুবি পাগল...”

বাসন্তির পেটে তখন অনশনরত অসংখ্য বুবুক্ষের অন্নপ্রাসনের প্রস্তুতি চলছে। তাই সে দেয়ালটা ধরে ব্যথাতুর শরীরটা টেনে তোলে। তারপর ধীরে ধীরে পা টেনে টেনে কদম দুই হেঁটে প্লেটের কাছটায় এসে বসে। ডান হাতের তর্জনী আঙ্গুলটা টলটলে ডালে ভাসা ভাতের ভেতরটায় গুঁজে দিয়ে ঘোটা দিতে দিতে হঠাৎ নাড়ি ছেঁড়া ধনটার কথা মনে পড়তেই বুকের ভেতরটা ভীষণ রকম বিষিয়ে ওঠল। ততক্ষণে বুকের ভেতরের প্রতিটি গ্রন্থি দুলে উঠে হলুদাভ স্রোতস্বিনীর প্রবাহে ফুলে উঠেছে। স্তন দু’টি দুধে ভার হয়ে বোঁটার বাইরে স্রোতটাকে ঠেলে দিল। বাসন্তির সদ্যপ্রয়াত মাতৃহৃদয় পুনুরুত্থানের ইঙ্গিত পেল যেনবা! দু’টো সাদা ভাত ক্ষুধার প্রবল গ্রাসে এভাবে সম্ভ্রম আর সন্তান দু’টোই কেড়ে নেবে জানলে, পাত থেকে ভাত ছুঁড়ে ফেলে বিধাতার হাত থেকে ঠিক ওদের বাঁচিয়ে আনত বাসন্তি। বাসন্তি চিৎকার করে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। দু’হাতের সমস্ত শক্তি দিয়ে মেঝেতে আঘাত করে খোদার আরশ কাঁপিয়েই দেবে যেনবা! প্রবল আক্রোশে বনবাসী স্বজনহারা শেয়ালের মত চিৎকার করে উঠল। ওর একটানা বোবাটে গোঁঙ্গানীময় আহাজারীতে মুখের ভেতর থেকে গলগল করে টকটকে রক্ত ছলকে পড়ছে, ওদিকে বুক সেই কখন ভিজে গেছে শাল দুধের কাল-অভিশাপে।

তমসা অরণ্য।
০৫/০৮/২০১১ থেকে ০৮/০৮/২০১১