Showing posts with label ব্লগ. Show all posts
Showing posts with label ব্লগ. Show all posts

আন্ধারের বুকে অনিচ্ছা নির্বাসন! (ব্যক্তিগত গদ্য)

পাগলামি ভয়ানক নয়; এরপরে সুস্থতায় ফিরে আসাটা ভয় ধরায় বৈকি! আর আর প্রাণীর চললেও, মানুষের অন্ধকার ভয় করলে চলে না। যা প্রতিনিয়তই বয়ে বেড়াতে হয়, তাতে ভয় করা মানে আলোর সন্ধানে না যাবার পাঁয়তারা। দু’টো দিন নিরন্তর অন্ধকার বাস চলল আমার। কোন রকম গ্রামার মানা ছাড়াই! রোজকার ভোজ গ্রহণ আর ত্যাগ ছাড়া কক্ষবন্দী নিজেই নিজের কাছে। প্রশ্ন আসে- কথা চলে চলছেই আশে-পাশে, অথচ আমার উত্তর ঘোর আকাশবন্দী.. শুন্যই থাকে... প্রশ্নদাতার প্রহর কাটিয়েও প্রশ্ন ঘটে জল ছিটায় না। প্রশ্নকর্তা ক্লান্ত হয়; জিজ্ঞাসায় ভর্তা বানাতে ব্যস্ত হয় অন্য কিছু। এভাবে হঠাত এলোমেলো হওয়া মানে কি সৃষ্টিশুন্য হবার ভয়? নয়; তাও নয়। তাই হলে কৌশলে লেখারা এভাবে চলতেই থাকত না। বাক-প্রতিবন্ধিতার মত ভয়ানক আর কিইবা হতে পারে? বলতে চেয়ে না বলতে পারা, না বলা, বলার অনিচ্ছ্বা... কি এর মানে? পাশের বাড়ির ছোট্ট মেয়েটি হুটোপুটি মেরে ছুটে আসে.. দৌড়ে কাছে আসতে নিতেই ধাক্কা খায়; দরজায় সচকিতে থমকে দাঁড়ায়! ভয় খাওয়া বোবাটে.. বোকাটে দৃষ্টি মেলে ফ্যালফ্যালে তাকিয়ে থাকা তাঁর! আমি বিরক্ত হই, আমার ক্লান্তি আসে। শেষে খাবার রেখেই উঠে দাঁড়াই, বেসিনে কলকলে জল ছেড়ে হাত ধুয়ে আসি। আবার কক্ষবন্দী হই অন্ধকারের গা ছুঁয়ে। অন্ধকার অজগরী ভঙ্গীতে আসে.. গ্রাস করার চেষ্টায় মগ্ন হই, বাহু লগ্ন হয়, অথচ, উলটো আমিই অন্ধকারের হাড়-মাংস চিবুনোর ভাব করে আধ-আঁধারী স্বাদ চাখি। বাড়িতে গ্রাম্য অতিথি আসে.. আমায় দেখে ড্যাবড্যাবে চোখ ফেটেই যাবে যেনবা! অত সব বিস্ময়ী দৃষ্টির ভাষা পড়তে আমায় দুর্বোধ্যতা পেয়ে বসে। আমি অক্ত অনুসারেই আবার ভেতরে ডুব দেই। দু’টো দিন পরেই নিজেকে দেখার সাধ জাগে। যতই বলি সব শেষেও মানুষ, সাধু-সন্ত তো নই। তাই পরশী আরশীটার নজরবন্দী হই। নিজেকে দেখে নিজেই ধাক্কা খাই। কে এ? আমি! এ কোন আমি? ভাবতে থাকি, ভাবনা আসে, আসবেই। যখন তুমি নিজেকে হারিয়ে নিজেকেই খুঁজবে.. নিজেকে না বোঝার কষ্টের সাথে ডুয়েলে যুঝবে, তখন ভাবনা দেবীর আসতেই হয়। উরোধুরো রাশ রাশ চুল বাঁশপাতার মতন তীক্ষ্ণতা নিয়ে আরশীটার ভেতর দিয়ে উদ্ভ্রান্ত ভাবে চেয়ে আছে। কপাল দখল করে চোখ এই ছুঁই তো ঐ ছুঁই! কেন যেন বাবুই পাখির কথা ভাবার চেষ্টা করি। আর তার বাসা। কিন্তু প্রাসঙ্গিকতা কোথায়?!

সমরেশ বসুর “প্রজাপতি” ও কিছু কথা।



গত বইমেলায় সময় দিতে না পারার ও মন মত বই কিনতে না পারার দুঃখ ঘোচাতে এবারের বইমেলা (২০১১) থেকে বেশ কিছু বই কিনেছিলাম। ফেরার পথে পা টেনে টেনে চলতে হচ্ছিল, তবু আনন্দে বুক ভরে যাচ্ছিল আমার। সেই গত দুমাস আগে কেনা বইগুলো পড়ার ফুসরত মিলছিল না। হঠাৎই হাতে যা সময় পাচ্ছি, তাই নিয়ে ঝুলে পরেছি বইগুলো পড়ব বলে। শুরু করেছিলাম তসলিমা নাসরিনের আত্মজীবনীনেই, কিছু নেইদিয়ে, কিন্তু তার পাশাপাশি হাতে তুলে নিলাম আরও একটি বই; নাম তারপ্রজাপতি”, লেখক সমরেশ বসু। প্রচ্ছদে আঁকা একটি পেরেকবিদ্ধ প্রজাপতি! বুঝলাম, রোমান্টিক বা সুখপাঠ্য কোন উপন্যাস নয় এটা। বলতে দ্বিধা নেই, কলকাতার দুচার জন লেখকের লেখার প্রতি আমার এক ধরণের ভাল লাগা কাজ করে। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় তাঁদের অগ্রভাগে। তবে সমরেশ বসুর আর কোন লেখাটি বিগত সময়ে পড়েছি, ঠিক মনে করতে পারছিলাম না; এখনও পারছি না। তবে এটা পড়ে কি এক বোধ যেন কাজ করছে, কি যে বোধ বুঝতে পারছি না। অনেকটা এ উপন্যাসের নায়ক চরিত্র সুখেন্দু যেমন নায়িকা শিখার মধ্যে কি যেন কি আছে টাইপ কিছু একটা খুঁজে ফেরে তার মত! সুখেন; সরকারি আমলা পিতার বখে যাওয়া কনিষ্ঠতম সন্তান। বড় দুই দাদার মত কলেজ জীবনেই রাজনীতির স্বার্থবাদী পাঠ শিখে কর্মজীবনে চাকরি-ব্যবসার পাশাপাশি বাঘা বাঘা দুই পার্টির হর্তা-কর্তা হয়ে এলাকা ভাগাভাগি করে গরিবের নাকের ডগায় মূলো ঝুলিয়ে তথাকথিত জনদরদী নেতা হয়ে উঠতে পারেনি। কলেজ টু আউট অফ কলেজ জীবনে চারপাশের মানুষের কারণে হয়ে উঠেছেসুখেন গুন্ডা’! দেখা হলে সকলে ভাল-মন্দ জিজ্ঞেস করে, পাড়ার বৌদিদের কাছে-পিঠে তার ডাক পড়ে, সরকারি বাবু থেকে পেটমোটা কারবারি; এমনকি দারোগা বাবু পর্যন্ত তাঁকে সমীহ করে চলে। এ কোন ভালবাসা নয়; ভয়। কারণ সবার ঘরের খবর, ঘট আর ঘটির খবর সবটাই যে তাঁর জানা! কাহিনীর শুরু একটা প্রজাপতিকে ধরা নিয়ে সুখেনের একরোখা চেষ্টা আর শিখার তা রুখে দেয়ার প্রাণপন চেষ্টা থেকে। মাঝে সুখেনের পরিবার, শিখার পরিবার, কলেজ জীবনের দাঙ্গাবাজী-হাঙ্গার স্ট্রাইকের স্মৃতিকথা, তাঁদের পাড়ার কিছু ভদ্রবেশী মানুষের সুকীর্তির(!) কথা, সুখেনের নারীজনিত নানা অভিজ্ঞতা, দাদাদের নোংরামী-দলাদলি ইত্যাদি ইত্যাদির পাশাপাশি শিখার প্রতি অজানা-অনাবিষ্কৃত আকর্ষণ বোধ (সুখেনের ভাষায় যাওর মধ্যে কি যেন একটা আছে”) গুন্ডামী জীবনের অন্যতম চ্যালা শিবের বোন মঞ্জরীর সাথে সুখেনের দেহজ সম্পর্ক আছে। এমনকি এ ধরনের মুহূর্তকালের বহু সম্পর্ক গড়েছে-ভেঙ্গেছে তাঁর জীবনে ভদ্দরলোক বলে খ্যাত বহু বাবুদের স্ত্রী, মেয়েদের সঙ্গে। কিন্তু কোনটিই যেন শিখার প্রতি যে নেশা তার মত নয়। শিখার নাড়ী-নক্ষত্র জানা থাকলেও, প্রতিনিয়ত কি যেন একটা অজানা কিছু খুঁজে পেতে চায় সুখেন। এই শিখার জন্যেই একসময় সাধারণ ছেলেটি হবার আকাঙ্খা পেয়ে বসে তাঁকে। স্কুল জীবনের নিরীহ শিক্ষক নিরাপদবাবুর মত নির্বিঘ্ন জীবনে ফিরে যেতে চায়। চোপড়া সাহেবের কাছে চাকরির কথা বলায় নিজেই অবাক হয়! কিন্তু সমাজ, সংসার, মানুষ তাঁকে তা হতে দিল কই? দাদাদের দলাদলি আর শত্রুপক্ষের নির্মম বলী হয় সুখেন। হরতাল চলাকালীন সময়ে পক্ষ আর বিপক্ষদলের যুগপৎ ছুটে আসা মিছিলের মুখে পরে এক দোকানে আশ্রয় নেয়া অবস্থায় দাঙ্গার মাঝে উড়ে আসা এক সর্বনেশে বোমার আঘাতে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সুখেনের সাধারণ কেউ হবার স্বপ্ন। হারাতে হয় চোখের আলো, পা আর হাত। এ উপন্যাসের কোন চরিত্রই অলৌকিক বা অতিলৌকিক নয়; সবাই বাস্তব জীবনের প্রতিনিধিত্ব করেছে। সুখেন যেন রাস্তার সেই চিরচেনা গুন্ডা ছেলেটি; মুখে যার অশ্রাব্য খিস্তি-খেউর, চোখে রঙ্গিন মদের নেশা আর মনে আপাত অশ্লীল সব ভাবনার বাসা! তবু সেই গুন্ডা হয়েও যেনএই গুন্ডানয় সুখেন, এই নয়টুকুরহয়না হওয়াটাই আমাদেরকে ভাবায়। শেষ পরিণতি ভেতরটা দুদ্দাড় করে কাঁপিয়ে দেয়। ঘৃণা কিংবা করুণা হয় না সুখেনদের প্রতি; হয় সমাজ আর তথাকথিত সমাজপতিদের প্রতি। একসময় বইটা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ভারতে। অশ্লীলতার দায়ে আদালতে চলেছিল মামলা। অভিযোগকারীর দাবি ছিল, তরুন সমাজকে বিপন্ন আর বিপথে চালিত করতে পারে এ উপন্যাস। উপন্যাসটি আদ্যোপান্ত পড়ে, হাস্যকর মনে হয়েছে সেই অভিযোগ! সাহিত্যে অশ্লীলতা আর জীবনে বাস্তবতা এ দুটি বিষয় অনুধাবনে পাঠককে অনেক দায়িত্বশীল হতে হয়। সত্য অনেক সময়ই নির্মম হয়; তা বলে.. মানব না? ছি ছি আর থু থুক্কারে অস্বীকার করে যাব! যে বয়সের পাঠক এই বইটি পড়ার আগ্রহবোধ করবে, তাঁকে কিছুটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে তবেই পড়তে হবে। কারণ, গতানুগতিক রক্ষণশীল সমাজমানস নয়; বরং এর সঠিক তাৎপর্য অনুধাবনে চাই তথাকথিত সমাজ নিরপেক্ষ প্রগতিশীল মন। আশা করি, যাপিত জীবনে অতি প্রচলিত দুএকটা কিংবা হোক না তা চল্লিশ-পঞ্চাশেক আপত্তিকর কথা; তা জীবনবাদী সাহিত্য পাঠে অভস্ত্য পাঠকদের শরীরে অথবা মনে এই বয়সে এসে সস্তা সুড়সুড়ি উদ্দীপক কোন অনুভূতির উদ্রেক করবে না। যাহোক, আমার বলার অনেক কিছুই আছে; ছিল। কিন্তু অন্ধের হাতি দর্শনের অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই আমার বন্ধুরা ভুলে যাননি! আর তাই অনেক কথা অনুক্ত রেখেই বলব -- ঝালের মজা যদি বুঝতেই হয়, তবে অন্যের জিভে না চেখে.. নিজের জিভেই চাখুন। উহা কত প্রকার ও কি কি, হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে যাবেন। আমি যতটুকু বললাম, তার অনেকটা জুড়েই যেন.. সুখেন আর শিখার প্রেম! অথচ, উপন্যাসটি মোটেও গতানুগতিক কোন প্রেমের কাহিনীনির্ভর উপন্যাস নয়; সুন্দর কোন কিছুর উপর সহজ একটা দাগের মত এর মূল থিমটাও কেমন যেন স্বাভাবিক। আরও স্বাভাবিক নায়ক সুখেনের মুখের অশ্লীলতা দোষেদুষ্ট স্ল্যাং ভাষাও। শুলাদা নামক অপ্রধান চরিত্রটাও কেমন যেন একটা দ্যুতিময় আশ্চর্য আভার সৃষ্টি করে! শিখা ঠিক রক্ত মাংসের একজন হয়েও যেন.. আর পাঁচটা মেয়ের মত নয়; কি যেন কি রহস্য আছে ওতে। প্রজাপতির প্রসঙ্গ বারবার এসেছে; বিষয়ের সাথে সামঞ্জস্যজনিত কারণেই। শুঁয়োপোকা থেকে প্রজাপতিতে রুপান্তরিত হবার মত একটা আকাঙ্খা, একটা চেষ্টা আর সুখেনের হাতে আহত সেই প্রজাপতির নিস্ফল আস্ফালনের সাথে বোমায় আহত সুখেনের বোধের সাথে সাদৃশ্য যেন তা-ই মনে করিয়ে দেয়। এলোমেলো ভঙ্গিতে ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার একটাই কারণ, পারেন তো.. বইটা পড়া থেকে বিরত থাকবেন না। ভাল লাগার গ্যারান্টি দিতে না পারলেও.. মন্দ না লাগার শত ভাগ গ্যারান্টি দেয়া বোধহয় কোকিল পুড়িয়ে গলা সুকন্ঠি করার মত অবিশ্বাস্য কিংবা দুঃসাহসী কিছু নয়! 


(১৯/০৫/২০১১)

যুদ্ধশিশু : জাতি আজ বিবেকের কাঠগড়ায়

Tamosha Aronna


একটা প্রবাদ আছে -- আমরা বাঙ্গালিরা নাকিভাবি বেশি, করি কম।” 
প্রবাদটির সত্যতা কতটুকু তা আমি জানি না, তবে নিজেকে দিয়ে কিঞ্চিত বুঝতে পারি বৈকি! কারণ, আজকের এই ভাবনাটা আমার অনেক দিনের। কিন্তু, লিখতে গিয়ে মনে হচ্ছে বড় বেশি সময় নিয়ে ফেলেছি। অতএব, বুঝাই যাচ্ছে আমার জীবনে এ প্রবাদ বাক্যের সত্যতা কতখানি! আমি তো একজন নগণ্য মানুষ মাত্র, যার চিৎকার করা ছাড়া আর কিছুই হয়তো বা করার নেই। কিন্তু আমাদের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা কেন এতদিন চুপ করে ছিলেন তা আজও আমার ঠিক বোধগম্য নয়। জানি, “বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে।কিন্তু তাই বলে যে বিচার প্রায় ৩৬/৩৭ বছর আগে হ ওয়ার কথা ছিল, তা এতদিনেও হয়নি কেন? কিসের স্বার্থে? কাদের স্বার্থে? স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নগুলো এসে যায়। বলার অপেক্ষা রাখে না আমি কাদের বিচারের কথা বলছি। আশার কথা, এতদিনেও যা হবার কথা হয়নি কিংবা হচ্ছি, হবে করে করেও হয়নি আজ তা হতে চলেছে এবং শুধু মুখে আর কাগজে-কলমে নয়, রীতিমত বাস্তব প্রয়োগ ঘটতে যাচ্ছে। সময় এসেছে আঘাত ফিরিয়ে দেওয়ার, এত বছর আগের পাপ পাপীকে এক এক করে মনে করিয়ে দিয়ে, পাই পাই করে তার প্রতিটি হসাব বুঝিয়ে দেওয়ার। বহু বছরের পুরনো পাপের বিচার যখন একবার বাস্তবায়িত হতে চলেছে, তখন পাপীদের ঘাড়ে পুরনো পাপের ভূত চেপে বসবে এটাই স্বাভাবিক। বিচার প্রক্রিয়া বানচাল করার প্রাণপণ চেষ্টা যে তারা করবে এটাও স্বাভাবিক। তবে বাবাজীদের ঞ্জাতার্থে বলে রাখা ভাল -- বাঙালি যখন একবার জেগেছে, তখন কার ঘাড়ে কটা মাথা যে তাদের দাবিয়ে রাখে? আর তাই বাবাজীরা মার মুখো না হয়ে যদি কূটকৌশল অবলম্বন করে লেজ কাটা শেয়ালের মত নতুন নতুন গল্প ফেঁদেও বসে, তবুও খাবারের লোভে কাঁটা বনের ঝোঁপে ঢুকে পড়া কুকুরের মত পালাবার পথ খুঁজে পাবে নাআর তাই ভূতের মত যারা মীরজাফরের সময় থেকে (তার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে!) বাঙ্গালির ঘাড়ে চেপে বসে, শোষকের পা চেটে চেটে কলাটা-মূলোটা পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে বিশাল বপু গড়ে তুলেছে, তাদের বলছি -- হুশিয়ার, সাবধান! বাঙ্গালিকে ঘাঁটাবার সাহস অতিতে দেখিয়েছ, কিন্তু এবার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও কোর না। বাঙ্গালির চোখে-মুখে-বুকে যে আগুন জ্বলছে, তাতে জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। গোড়স্থানে গোঁড় দেবার, শ্মশ্মানে পোড়াবার সময়টুকুও হয়তো আত্মীয়-স্বজনের হবে না। নিশ্চিত জেনো -- তোমাদের পাপিষ্ঠ দেহের ছাই বাংলার আকাশে-বাতাসেও উড়বে না। তবে, হাবিয়ায় নিশ্চিন্ত ঠাঁই মিললেও মিলতে পারে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রাসঙ্গিকতায় আরও একটি বিষয় এসে যায় যা না বল লেই নয়, আর তা হল যুদ্ধ শিশুদের কথা (আমি যাদের বলছি যুদ্ধ যীশু)। আমরা জানি, যীশুর কোন পাপ ছিল না। কিন্তু তবুও তাঁকে পাপীদের হাতে ক্রুশবিদ্ধ হতে হয়েছিল। সব শিশুরাই যীশুর মত নিষ্পাপ। তবু কখনও কখনও জন্মকেও প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়। এক একটি শিশুর জন্ম মানে তার পরিবার-পরিজনদের জন্য অনাবিল আনন্দ উতসব কিন্তু একটা শিশুর জন্মটাই যদি এমন হয় যে তাকে স্বাগত জানানোর কোন আগ্রহই তার পরিবার-পরিজন কিংবা এ সমাজ-সংসারের নেই, তখন? যদি এমন হয় -- মায়ের গর্ভে তার আকস্মিক ঘোষণা এক অজানা আশঙ্ঙ্কায় শঙ্কিত করে তোলে তার গোটা পরিবারকে, তখন? এ ঘটনাগুলোই ঘটেছিল একাত্তরের যুদ্ধ শিশুদের বেলায়, আজ থেকে ৩৭ বছর আগে। চিন্তাও করা যাবে না সেদিনের সেই দৃশ্যপটগুলো। একজন নবীন কিশোরী মায়ের জন্য তা ছিল কতটা দুর্বিষহ, তা একমাত্র সর্বাংসহা পৃথিবীই জানে। ভাবা যায়, সমাজের ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে আসছে নবীন মায়ের মুখ। হয়তো স্কুলের পাঠ তখন শেষি হয়নি। জীবনের পরতে পরতে যে বিভতষতা তার সাথে কখনও পরিচয় ঘটেনি যাদের, সেই কিশোরী মুখগুলোকে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল কী কঠিন বাস্তবতার সম্মুখে! যেখানে প্রতিনিয়তই আগুনের আঁচ বুকে লেগে পুড়ে যায় সকল মানবিকতাবোধ, সম্মুখীন হতে হয় নিষ্ঠুরতার-নির্মমতার। আজ থেকে ৩৭ বছর আগে বহু কিশোরী মাকে উপনীত হতে হয়েছিল অসম যুদ্ধে। সন্তানের এক ফোঁটা সুখের আশায় নিংড়ে দিতে হয়েছিল জীবনকে, পাই পাই করে বুঝিয়ে দিতে হয়েছিল সমাজে বেড়ে ওঠার মূল্য। একাত্তরে যুদ্ধ শিশুদের কেউ চায়নি। তাদের পরিবার চায়নি, এ পৃথিবী চায়নি, এ সমাজ চায়নি, কেউ চায়নি, কেউ না। কারণ, সত্যকে যে মানুষের বড় ভয়। তবুও তারা এসেছে। ছোট্ট জীবন বিন্দু মাত্র, অথচ পরিবার-সমাজ-সংসার সবার উপেক্ষার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল এ সম্ভাবনার। কেউ চায়নি তারা আসুক, তবুও তারা এসেছে শত বছরের সংস্কারের শৃঙ্খল ভাংতে, বিদ্রোহ ঘোষণা করতে। কতটা নিষ্ঠুর হলে, কতটা বর্বর হলে একটা মানুষ কৃতঘ্ন হয়ে উঠতে পারে তার একটা বড় পরিচয় আমাদের এই সমাজ। যাদের জীবনের বিনিময়ে, যাদের রক্তের বিনিময়ে, যাদের ইজ্জতের বিনিময়ে, যে সকল ভ্রুনেই নষ্ট করে ফেলা জীবনের বিনিময়ে আমরা পেলাম আমাদের লাল-সবুজ পতাকা, মানচিত্র, ভাষা, স্বকীয় জাতিসত্তা -- সামগ্রিকভাবে চির আকাঙ্খিত স্বাধীনতা, সেই অগণিত নিবেদিত প্রাণ শহীদ, বীরাঙ্গনা, মুক্তিযোদ্ধা আর যুদ্ধ শিশুদের প্রতি আমাদের আজকের কৃতজ্ঞতা সত্যিই কৃতঘ্ন জাতির স্মারক বহন করে বৈকি! একজন নারীর জন্য ট্রয় নগরী যুদ্ধের আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছিল, সে কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যে হাজার হাজার নারীর সম্ভ্রম হায়েনাদের লালসার আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গিয়েছিল তার পরিসংখ্যান কি বাঙালি রেখেছে? রাখেনি। আমি শুনেছি, আজও অনেক মায়ের চোখের দৃষ্টি অসীমের পাণে কি যেন খুঁজে বেড়ায়। তাঁদের ভারাক্রান্ত হৃদয়ে অসীম এক শূন্যতা। কি খুঁজে বেড়ায়? তার হারানো শিশুকে। কিসের শূন্যতা? সন্তান হারানোর শূন্যতা। একজন মায়ের কাছ থেকে সন্তানকে আলাদা করে ফেলা যে কত বড় পাপ তা যদি এ সমাজ জানতো, তবে একাত্তরে এ ভুল তারা কখনই হয়তো করতো না। ৩৭ বছর আগে খোদার আরশ কেঁপে উঠেছিল এ সমাজের বর্বরতা দেখে। আর তাই তো আজও সেই পাপের ফল ভোগ করছে এই সমাজ। আমার লেখাটিকে যদি কেউ যুক্তি-তর্কের নিরিখে বিচার করতে বসে, তবে এই  লেখার সত্যে সে বাঁধা পড়বে না। কারণ, আমি প্রবন্ধ লিখতে বসিনি, বসেছি এক জাতির হারানো সম্পদ আর তা আজও খুঁজে না পাওয়ার ব্যর্থতার ফিরিস্তি লিখতে। তাই পাঠক সমাজের কাছে আমার আর্জি থাকবে -- তারা যেন আবেগ তাড়িত হয়ে এ কলাম পড়েন, যুক্তির নিরিখে নয়। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না আমরা সত্যের বাঁধনে বাঁধা। সব সত্যকে যুক্তি দিয়ে বিচার করা যায় না, এ জন্য চাই হৃদয়ের গভিরতা, বাঁধভাঙ্গা আবেগের জোয়ার। কারও কারও জন্মটাই ব্যথার, জীবন-যাপনটাও ব্যথার। আর এভাবেই এক সময় ব্যথাটাই অনেকের জীবনে চোখের মতই অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনি আমাদের এই স্বাধীন দেশের জন্মটাও ব্যথার, জীবন-যাপনটাও ব্যথার। আর সেই ব্যথাটাই আজ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে আমাদের জীবনে।

(বি.দ্র. : সরকারকে মনে রাখতে হবে যে, এনালগ সত্য ও স্বপ্নগুলোকে বাদ দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়। আর তাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া যেমন শুরু হতে চলেছে, তেমনি সময় এসেছে যুদ্ধ শিশুদের বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার।)


( এই লেখাটি ২০০৯ সালের ১৬ই জুলাইদৈনিক জনকন্ঠপত্রিকারচতুরঙ্গপাতায় প্রকাশিত হয়েছিল।)